কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ এ ১১:৫৭ AM

বিটিআরসি'র ইতিহাস

কন্টেন্ট: পাতা

বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ সেবার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসেবে এ অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয় টেলিগ্রাফ আইন, ১৮৮৫ প্রণয়নের মাধ্যমে। পরবর্তীতে বেতার যোগাযোগের বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফি আইন, ১৯৩৩ প্রণয়ন করা হয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার দক্ষ পরিচালনা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড (BTTB) অধ্যাদেশ, ১৯৭৯ জারি করা হয়। এর মাধ্যমে টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন সেবার ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড (বিটিটিবি) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে অধ্যাদেশটি সংশোধনের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আরও সুসংহত করা হয়। সে সময় বিটিটিবিই ছিল দেশের একমাত্র মৌলিক (Basic) টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে টেলিযোগাযোগ খাতে কনভারজেন্স (Convergence)-এর যুগের সূচনা হয়। কেবল কণ্ঠভিত্তিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে মোবাইল যোগাযোগ, স্থির টেলিফোন (PSTN), ডেটা, ইন্টারনেট, বার্তা আদান-প্রদান, মাল্টিমিডিয়া, সম্প্রচার, বিনোদন, ব্যাংকিং, বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন সেবা একই প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মে একীভূত হতে শুরু করে।

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের উদারীকরণ শুরু হয় ১৯৮৯ সালে, যখন প্রথমবারের মতো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সেলুলার মোবাইল টেলিফোন সেবা প্রদানের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া সেবার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে দেশে স্থির (Fixed) ও মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবার দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে এ খাত উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করে।

টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি ও সেবার এই দ্রুত বিকাশের ধারাবাহিকতায় আধুনিক ও যুগোপযোগী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ (আইন নং–১৮, ২০০১) প্রণয়ন করা হয় এবং ১৬ এপ্রিল ২০০১ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

এই আইনের আওতায় একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। কমিশন ৩১ জানুয়ারি ২০০২ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। কমিশনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের টেলিযোগাযোগ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং নিয়ন্ত্রক কার্যাবলি বিটিআরসি'র নিকট ন্যস্ত করা হয়।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ অনুযায়ী কমিশনের প্রধান দায়িত্বসমূহের মধ্যে রয়েছে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও স্থাপনা স্থাপন, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণ; টেলিযোগাযোগ সেবার লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন; রেডিও স্পেকট্রামের দক্ষ ব্যবস্থাপনা; গ্রাহকস্বার্থ সংরক্ষণ; সেবার মান (Quality of Service) নিশ্চিতকরণ; ট্যারিফ ও চার্জ সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ; প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকির মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ধারা ৬(৯) অনুযায়ী কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ (Statutory) প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজস্ব সরকারি সিলমোহর ব্যবহার, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন ও সংরক্ষণ, চুক্তি সম্পাদন, সম্পত্তি হস্তান্তর এবং আইন দ্বারা অর্পিত অন্যান্য দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা ভোগ করে।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) আইন, ২০১০ প্রণয়ন করা হয়। সংশোধিত আইনের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান, আন্তর্জাতিক কল রাউটিং, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি আমদানি, মালিকানা হস্তান্তর এবং লাইসেন্স প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের পূর্বানুমোদনের বিধান সংযোজন করা হয়। একই সঙ্গে আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জরিমানা ও দণ্ডের বিধান আরও কঠোর করা হয়।

বাংলাদেশের টেলিকম খাতকে আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও ভবিষ্যৎমুখী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে টেলিকম নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং পলিসি, ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান লাইসেন্সিং কাঠামোকে সহজীকরণ, প্রযুক্তিনিরপেক্ষ ও সেবাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করা। নীতিমালার আওতায় টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও সেবার লাইসেন্সিং কাঠামোকে আরও যুগোপযোগী ও সমন্বিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো ভাগাভাগি, নেটওয়ার্কের দক্ষ ব্যবহার, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি গ্রহণ, ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণ, সেবার মানোন্নয়ন এবং গ্রাহকস্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রবর্তিত লাইসেন্সিং কাঠামোটেলিযোগাযোগ খাতের বিদ্যমান জটিলতা নিরসন এবং মধ্যস্বত্বভোগী স্তরের ওপর নির্ভরতা হ্রাসের লক্ষ্যে নতুন নীতিমালায় প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ পাঁচটি বিস্তৃত শ্রেণিতে লাইসেন্সিং কাঠামোকে বিন্যস্ত করা হয়েছে:

ক. ইন্টারন্যাশনাল কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (ICSP)

খ. ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (NICSP)

গ. অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক সার্ভিস প্রোভাইডার (ANSP)

ঘ. নন-টেরেস্টিয়াল নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সার্ভিস প্রোভাইডার (NTNSP)

ঙ. টেলিকম এনাবলড সার্ভিস প্রোভাইডার (TESP)

এই সুসংহত কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানসমূহ ফাইবার, ওয়্যারলেস, স্যাটেলাইট কিংবা ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ আইপি-ভিত্তিক ট্রাফিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হবে । এটি অপারেটরদের পরিচালন ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি সেবার গুণগত মানোন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে ।

টেলিযোগাযোগ খাতের দ্রুত পরিবর্তিত প্রযুক্তিগত বাস্তবতা, ডিজিটাল অবকাঠামোর বিকাশ এবং আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন (সংশোধন), ২০২৬ প্রণয়ন করা হয় এবং তা বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়। সংশোধিত আইনের মাধ্যমে কমিশনের নিয়ন্ত্রক কার্যক্রমকে আরও যুগোপযোগী, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিধান হালনাগাদ করা হয়। এর ফলে স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, লাইসেন্সিং কাঠামো, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা, গ্রাহকস্বার্থ সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিনিরপেক্ষ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কমিশনের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করে। পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই সংশোধনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরবর্তীকালে টেলিযোগাযোগ খাতের পরিবর্তিত প্রযুক্তিগত বাস্তবতা, ডিজিটাল অবকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৫১ নং আইন) প্রণয়ন করা হয় এবং ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং আইনটি ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হয়।

এই সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ করা হয়; অর্থাৎ আইনের নাম থেকে "নিয়ন্ত্রণ" শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। উক্ত সংশোধনীর মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিন্ত্রণ কমিশন’-এর পরিবর্তে কমিশনের নাম ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন’ (বিটিআরসি) নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স প্রদান ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে অধিকতর আধুনিক, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়।

এছাড়া জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো এবং নেটওয়ার্কের সাইবার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আধুনিক আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও হালনাগাদ করা হয়। ২০২৬ সালের এই সংশোধনীর মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য একটি অধিকতর আধুনিক, বিনিয়োগবান্ধব, প্রযুক্তিনিরপেক্ষ এবং নিরাপদ নিয়ন্ত্রক পরিবেশ নিশ্চিত করার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। এর ফলে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহকস্বার্থ সংরক্ষণে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের কার্যক্রম আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী রূপ লাভ করে।

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন